বাংলার নারী সমাজের নবজাগরণে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) একটি আলোকশিখা। নারীশিক্ষা, অধিকার ও মুক্তির পথে তিনি অগ্রদূত। প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর \'রোকেয়া দিবস\' পালনের মাধ্যমে আমরা তাঁর স্মৃতি, চেতনা ও সংগ্রামকে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু তাঁর আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনও বহু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। নারীমুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকের সমাজে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে আসে। রোকেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নারীমুক্তি নয়, বরং যুক্তিবাদ, মানবাধিকার, আধুনিকতার প্রসার। তাই রোকেয়া দিবস আমাদেরকে একদিকে প্রগতির অনুপ্রেরণা দেয়, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়।
রোকেয়ার সংগ্রামের মূল কেন্দ্র ছিল নারীশিক্ষা। শত বছর পরও শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। শহর-গ্রাম বৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক অনীহা, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে অনেক কন্যাশিশু উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যেতে পারে না। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বেশি। শিক্ষার গুণগত মানও বড় চ্যালেঞ্জ; ডিজিটাল শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতায় মেয়েদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে রোকেয়া যে জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনস্কতার কথা বলেছিলেন তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
রোকেয়া সমাজে নারীর স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে এখনও বহু রক্ষণশীল মানসিকতা টিকে আছে। নারীর পোশাক, চলাফেরা, ক্যারিয়ার, বন্ধুত্ব, এমনকি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও সমাজের হস্তক্ষেপ রয়ে গেছে। পরিবারতন্ত্রের চাপে বহু নারী নিজের স্বপ্ন পূরণে পিছিয়ে যায়। এই মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরগতির; রোকেয়া যে মুক্তচিন্তার পথ দেখিয়েছিলেন তা সমাজের একটি বড় অংশ আজও গ্রহণ করতে দ্বিধায় থাকে।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও রোকেয়া দিবসের বড় চ্যালেঞ্জ। বাল্যবিবাহ, যৌন সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, সাইবার বুলিং, গৃহ-সহিংসতা নারীদের স্বাভাবিক জীবনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মেয়েই নিরাপত্তার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ করে, চাকরি ছেড়ে দেয়, কিংবা সমাজের আগ্রাসী মন্তব্যের মুখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সহিংসতার ভয় নারীর স্বাধীন বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। রোকেয়া বলেছিলেন, নারীর ভয়হীন স্বাধীনতা ছাড়া সমাজে মুক্তি আসবে না—কিন্তু আজও সেই নিরাপত্তা যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ভিত্তি পায়নি।
রোকেয়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে নারীর মুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতেন। অথচ আজও নারীরা কর্মক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়—মজুরি বৈষম্য থেকে শুরু করে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীর কম উপস্থিতি, গৃহস্থালিক শ্রমের অস্বীকৃতি, মাতৃত্ব ও পেশাগত জীবনের দ্বৈতচাপ, উদ্যোক্তা হতে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলে নারী নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে রোকেয়ার আদর্শ অনুযায়ী স্বাধীন ও আত্মপ্রত্যয়ী নারী তৈরি করা কঠিন হয়ে ওঠে।
রোকেয়া নারীর মতামত, কণ্ঠস্বর ও নেতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। আজ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বেড়েছে বটে, কিন্তু বাস্তবে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি এখনো সীমিত। অনেক নারী কোটা-নির্ভর হলেও প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান না। রাজনৈতিক দলে নারীর অবস্থান অনেক সময় প্রতীকি হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি রোকেয়ার ‘স্বরাজ ও আত্মমুক্তি’-র দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
রোকেয়া ছিলেন ভবিষ্যতদ্রষ্টা, যিনি নারীকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছিলেন। আজকের বিশ্ব ডিজিটাল—কিন্তু নারীরা এখনো প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে।ডিজিটাল শিক্ষা গ্রহণে মেয়েদের সুযোগ কম, ইন্টারনেটে নিরাপত্তাহীনতা,প্রযুক্তিভিত্তিক পেশায় নারীর প্রতিনিধিত্ব কম,কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ।এসব কারণে প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজে নারীরা সমমর্যাদার জায়গা পাচ্ছে না।
রোকেয়ার চিন্তা অনেক সময় শুধু নারীশিক্ষা বা পর্দা-বিরোধ আন্দোলনে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বহুমাত্রিক—ন্যায়বোধ, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, ভাষাবোধ, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক সংস্কার ইত্যাদি। ফলে, রোকেয়া দিবস অনেক জায়গায় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে; গবেষণা, পাঠ, আলোচনার গভীরতা কম হয়ে পড়ে।
রোকেয়া বলেছিলেন, নারীকে অগ্রসর হতে হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিন স্তরকে বদলাতে হবে। আজও এই তিন স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। পরিবারে মেয়েকে সমান সুযোগ দেওয়া হলেও সমাজে বাধা আসে, আবার সমাজে সহায়তা থাকলেও রাষ্ট্রীয় নীতিতে ঘাটতি থাকে। এই অসম সমন্বয় রোকেয়া দিবসের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
পরিশেষে বলতে চাই যে, রোকেয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীশিক্ষা, অধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন এখনও অসম্পূর্ণ। রোকেয়ার দর্শন কেবল নারীমুক্তির নয়, মানবমুক্তির। তাঁর স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসিকতা ও কাঠামোগত বৈষম্যকে ভাঙা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।রোকেয়া দিবস তাই স্মরণ নয়—সংকল্পের দিন। সমাজকে আরও মানবিক ও যুক্তিবাদী পথে এগিয়ে নিতে হলে রোকেয়ার চেতনায় অনুপ্রাণিত কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে।
মতামত