শিক্ষাঙ্গন

রোকেয়ার চিন্তা ও বর্তমান সমাজ

প্রিন্ট
রোকেয়ার চিন্তা ও বর্তমান সমাজ

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, দুপুর ১২:৪৭


বাঙালি নারী জাতির কাছে রোকেয়া মানে এক অন্তহীন প্রেরণা। যে প্রেরণা আমাদের সামনে চলতে সাহস জুগিয়েছেন। বিখ্যাত এই প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক, লেখিকা (১৮৮০-১৯৩২) তাঁর জীবদ্দশায় নারীদের জন্য লড়ে গেছেন। দিয়েছেন এক সমুদ্র পরিমাণ আশার বাণী। সেই সময়ের অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে স্বামী ও ভাইয়ের সহায়তায় পড়াশোনা করে নারীদের বন্দি অবস্থা থেকে বের করে আনতে হাতে তুলে নেন কলম, শুরু করেন লেখালেখি। বাড়ি -বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য অনুপ্রেরণা জোগান। তৎকালীন সময়ে আশানুরূপ ফলাফল না পেলেও বর্তমান সময়ে ঘরে ঘরে নারীরা পড়াশোনা করছে ডিগ্রি নিয়ে বাইরের দেশে যাচ্ছে। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের পদচারণা লক্ষ করা যাচ্ছে। যা রোকেয়া দর্শনের সফলতাকে পক্ষান্তরে ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।

রোকেয়া যখন নারীদের পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার জন্য লড়াই করতে থাকে তখন নারীরা ছিল পর্দাপ্রথার আড়ালে।বাড়ির বাইরে তাদের বের হওয়া নিষিদ্ধ। রোকেয়া তখন অবগুণ্ঠন সহ মেয়েদের বাহিরে বের হওয়ার আহ্বান জানান। আরো জানান দেন অবগুণ্ঠনের আড়ালে রেখে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের শুধু শোষণ করতে চায়। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার অর্জনে বাঁধা দিতে।এ থেকে মেয়েদের মুক্তি দিতে পারে একমাত্র শিক্ষা। শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, চলাফেরা করার স্বাধীনতা। তাদের পড়াশোনার জন্য গড়তে হবে প্রয়োজনীয় মহিলা স্কুল, কলেজ।

রোকেয়ার সময়কালে ১৯২৩ সালে লীলা নাগ নামে এক মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেছে। আবার ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এমনকি কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমরা মেয়েদের অবস্থান দেখতে পাই। ছেলেদের পাশাপাশি একইসাথে তারা রাস্তায় নামছে মিছিল মিটিং করছে নানামুখী স্লোগান দিচ্ছে।সফলতা ব্যর্থতার কোনো তোয়াক্কা না করে অপনাম সহ্য করে হলেও দিন শেষে রুখে দাঁড়াবার সক্ষমত অর্জন করছে।মুক্তিযুদ্ধে আমরা দেখি প্রায় ২ লাখ মা বোন তাদের প্রাণ, আত্নসমভ্রম সব বিসর্জন দিয়ে হয়েছেন বীরাঙ্গনা। নারী একবার মা, একবার বোন, একবার সন্তানের মতো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কখনো খাবার দিয়ে, কখনো অস্ত্র দিয়ে, কখনো বা কথা দ্বারা তাদের পাশে থেকে উৎসাহ যুগিয়েছেন।  

কিন্তু এত কিছুর পরও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অহরহ নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা মোটামুটি সবাই অবগত আছি যে, ২০২৫ সালের মে মাসে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় আছিয়া নামে তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী বোনের বাড়ি গিয়ে হিটু শেখের হাতে নিপীড়নের শিকার হয় এবং মারা যায়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র - আসক এর তথ্য অনুযায়ী," ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন নারী"। ছোট বাচ্চাদের নিরাপত্তা নেই, বাড়ির বউদের নিরাপত্তা নেই মহিলা কর্মকর্তা, স্কুল কলেজের ছাত্রীদের নিরাপত্তা নেই রাস্তাঘাটে। সেজন্য প্রতিনিয়ত নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ব্যাধির মুখে পড়ছেন মা বোনরা।এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হলেও তবু নিরাপত্তা হীনতায় থাকে সকল স্তরের নারীরা।

রোকেয়া চেয়েছিল একটা সুস্থ সমাজ, পরিবেশ যেখানে নারীরা পাবে স্বাধীনতা।যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই নারীরা পড়াশোনা করছে বিভিন্ন পেশায় চাকরি করছে পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তরপরেও নারীরা রাতে কিংবা দিনের যেকোনো সময়ে একা একা বাইরে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না।একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করেও বাস্তবিক স্বাধীনতা পুরুষদের থাকলেও নারীদের নেই। এমন সমাজের কল্পনা রোকেয়া করেননি।

এজন্য সকলের সচেতন হওয়া উচিত।পুরুষদের পাশবিক মানসিকতা পরিহার করে নারীদের সামনে এগিয়ে যেতে তাদের সহায়তা করা দরকার। যাতে তারা পুরুষদের সমক্ষক হয়ে তাদের প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তির প্রখরতা দ্বারা নিজের এবং ভবিষ্যতে দেশের কাজে আসতে পারে।এজন্য রোকেয়ার মতে নারীদের শিক্ষা, চিন্তার স্বাধীনতা দরকার জাতি- ধর্ম- বর্ণ- নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য।