কাহারোল

কাহারোলে অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় সনাক্ত, হত্যাকারী স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার

প্রিন্ট
কাহারোলে অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় সনাক্ত, হত্যাকারী স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার

প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:০৫


দিনাজপুরের কাহারোলের ঢেপা নদী থেকে অজ্ঞাতনামা অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের দীর্ঘ প্রায় চার মাস পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে কাহারোল থানা পুলিশ।

মেহেদী হাসান নিখোঁজ হওয়ায় তার পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর ঝিনাইদহ সদর উপজেলার থানায় গেলে থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় ঢেপা নদীতে অজ্ঞাতনামা একটি লাশের ছবি দেখালে তারা মেহেদী হাসানকে শনাক্ত করে। পরে তারা দিনাজপুরের কাহারোল থানায় এসে অজ্ঞাত নামা লাশের কাপড়চোপড় দেখে নিশ্চিত হন।

তারই সূত্র ধরে,তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার , নিবিড় অনুসন্ধান ও আসামী গ্রেফতারের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পেরেছে পরকীয়া ও মোবাইলে ধারণ করা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করার জেরেই পরিকল্পিতভাবে মেহেদী হাসান (২৬) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক নারী ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে কাহারোল থানা পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন দিনাজপুর সদর উপজেলার সদরপুর এলাকার শিল্পি আক্তার (৩২) এবং তার স্বামী মো. আব্দুল মোমিন রকি (৩৮)। নিহত মেহেদী হাসান ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফকিরাবাদ এলাকার মো. রবিউল ইসলামের ছেলে।

কাহারোল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. মনিরুজ্জামান ও কাহারোল থানার অফিসার ইনচার্জ সেলিমুর রহমান সেলিম (ওসি) যৌথ উদ্ধৃতি দিয়ে আমাদের প্রতিনিধিকে জানান,কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদী থেকে মেহেদীর লাশটি যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তা ছিল একেবারেই অর্ধগলিত ও বিকৃত অবস্থায়। নিহতের বাড়ি সুদূর ঝিনাইদহ জেলায় হওয়ায় অজ্ঞাতনামা মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালিয়ে যায়। পরে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় সনাক্ত না হলে শেষে দিনাজপুর আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দিনাজপুর শেখ জাহাঙ্গীর কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

  এরপরও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাহারোল থানা পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রাখে। দীর্ঘ প্রায় চার মাসের অনুসন্ধান,তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও বিভিন্ন তথ্য উদঘাটনের মাধ্যমে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরে নিহতের মোবাইল ট্র্যাকিং ও কললিস্টের সূত্র ধরে পুরো হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে থাকে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে,মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঝিনাইদহের তরুণ মেহেদী হাসানের সঙ্গে বিবাহিত নারী শিল্পি আক্তারের পরিচয় ও পরকিয়া চলতে থাকে । পরবর্তীতে শিল্পি বিবাহিত জেনেও মেহেদী ঝিনাইদহে গিয়ে তাকে বিয়ে করেন এবং তারা বিভিন্ন স্থানে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে অবস্থান করেন। এ সময় মেহেদী তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও নিজ মোবাইলে ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে ঐ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিল্পির কাছে বিভিন্ন সময় টাকা দাবি করতেন তিনি। সংসার ও ব্যক্তিগত খরচ বাঁচিয়ে শিল্পি কিছু টাকা পরিশোধ করলেও মেহেদীর দাবি বাড়তে থাকে।

শিল্পির স্বামী আব্দুল মোমিন রকি পেশায় বিআরটিসি বাসের হেলপার। তিনি দিনাজপুর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে কাজ করেন। তিনি কাজের সূত্রে বাইরে থাকলে মেহেদী শিল্পির বাড়িতে আসতেন। বিষয়টি জানতে পেরে তাদের সংসারে তীব্র অশান্তি শুরু হয়।

তদন্তে জানা যায়,গত ২৫ মে ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে মেহেদী শিল্পি আক্তারের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহ থেকে দিনাজপুরের দিকে আসে। রাত ১০টার দিকে তিনি শিল্পির বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে রাতযাপনের পর মেহেদী আবারও ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শিল্পি আক্তার তার স্বামী রকিকে বিষয়টি জানান। এরপর দুজন মিলে মেহেদীকে টাকা দেওয়ার কথা বলে কৌশলে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি অটোরিকশায় করে মেহেদীকে কাহারোল উপজেলার ৫ নম্বর সুন্দরপুর ইউনিয়নের গড়নুরপুর আশ্রমঘাট এলাকায় নেওয়া হয়। পরে ভদ্রাকালী মন্দিরের দক্ষিণ পাশে ঢেপা নদীর তীরবর্তী নির্জন স্থানে নিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর লাশ গোপন করার উদ্দেশ্যে মরদেহটি নদীর পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার পর এবং আদালতের সোপর্দ করলে বিজ্ঞ আদালতে আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন ।