শিক্ষাঙ্গন

নারী মুক্তি ও বেগম রোকেয়া

প্রিন্ট
নারী মুক্তি ও বেগম রোকেয়া

প্রকাশিত : ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, দুপুর ১২:২৫


নারী জাতির অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) এমন একজন নারী যিনি এদেশের বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণ ও শিক্ষার পথিকৃৎ। ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের একজন অন্যতম ব্যক্তি বেগম রোকেয়া। তার কার্যক্রম তথা নারী মুক্তির আন্দোলন, সংগ্রাম এবং ত্যাগ শুধু বাঙালি মুসলিম নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশে, প্রতিটি জাতিতে পৌঁছে গিয়েছে এবং তাঁর স্থান করে দিয়েছে বিশ্বের সুউচ্চ মঞ্চে।

১.

 'বেগম রোকেয়ার নারী অধিকার, চেতনা ও সমাজ নির্মাণ মানসিকতার যথার্থ রেখাপাত ঘটেছে তাঁর সৃজন ও কর্মে।' তিনি 'একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক' হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রচিত সাহিত্য প্রকৃষ্ট সাহিত্যের চেয়ে বেশি স্থান অধিকার করে নারী স্বাধীনতার পথিকৃৎ হিসেবে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম নারী হিসেবে তিনিই উপলব্ধি করেছিলেন নারী মুক্তির একমাত্র পথ "শিক্ষা ও স্বনির্ভরতা"। তিনি নিজে শিক্ষিত হলেন এবং জাতির জন্য রেখে গেলেন অসামান্য কর্ম মতিচূর, অবরোধবাসিনী, পদ্মরাগ, সুলতানার স্বপ্ন, অর্ধাঙ্গিনী, গৃহ ইত্যাদি শীর্ষক রচনা। 'সবই তাঁর সমাজ জীবনের গভীর উপলদ্ধি থেকে উৎসারিত এবং তিনি বারবার তাঁর লেখায় নানাভাবে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তুলেছেন। '

'বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।'(নজরুল রচনাবলি)

ঠিক তাই বিশ্বে যা কিছু মহান এবং কল্যাণকর সৃষ্টি তার সব কিছুর মূলেই রয়েছে নারী ও পুরুষের সমান অবদান। মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় মানব সভ্যতার টিকে থাকা লড়াইয়ে নারী-পুরুষের সমান অবদান ছিল। নারী-পুরুষ সমান তালে টিকে থাকার লড়াইয়ে সংগ্রাম করে গেছে। পাহাড়ের গুহায় বসবাস, বনের শিকার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ এবং কৃষিকাজের প্রচলনেও ছিল নারীর বিশেষ ভূমিকা। বিবর্তনের ধারায় আজকের এই আধুনিক বিশ্বেও নারীরা সমান ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

২.

রোকেয়ার যে সময় জন্ম সে সময় মুসলিম নারীরা ছিল চরম অবহেলিত, লাঞ্ছিত এবং গৃহবন্দী। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মুসলিম সমাজের কারণেই তারা এই বন্দি দশা মেনে নিতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা এমন যে 'আত্মীয় পুরুষ তো দূরের কথা বহিরাগত মহিলাদের সামনেও মেয়েদের পর্দা নিতে হতো।' নারীরা সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে পারতো কোরান ও উর্দু ভাষা। রোকেয়ার পিতা আবু আলী হায়দার সাবের নিজে বহু ভাষায় সুপন্ডিত হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন একেবারে রক্ষণশীল। ঐতিহ্যবাহী এই সাবের পরিবারে শুধু মেয়েদের জন্য নয় পুরুষদের জন্যও বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে রোকেয়ার সহোদর ইব্রাহিম সাবের ছিলেন আধুনিক মননের মানুষ। তিনি এবং তার ভাই খলিলুর রহমান সাবের সর্বপ্রথম সাবের পরিবারের ঐতিহ্য ভেঙে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষার প্রতি রোকেয়ার অদম্য উৎসাহ দেখে ইব্রাহিম সাবের রাতের অন্ধকারে রোকেয়া'কে বাংলা ও ইংরেজি শেখাতেন। নারী মুক্তির আন্দোলনে পথ যাত্রায় ভাইয়ের পরে তাঁর জীবনে আগমন ঘটে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শহীদ সাখাওয়াত হোসেন-এর। তার সাথে রোকেয়া ১৮৯৬ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মুক্তমনা ও উদার মনের অধিকারী স্বামীর ঐকান্তিক চেষ্টা ও প্রেরণায় রোকেয়া বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। নারীবাদী সাহিত্যের মাইলফলক হিসেবে রোকেয়া রচনা করেন 'Sultana's Dream'(সুলতানার স্বপ্ন)। দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯০৮ সালে স্বামীর মৃত্যুতে বৈধব্য তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর মনে ছিল অসীম সাহস, অকাল বৈধব্যের শোক'ই ছিল তাঁর মূল "শক্তি"। ১৯০৯ সালে স্বামীর প্রদত্ত অর্থে ভাগলপুরে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস' স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১০ সালে স্বামীর সঞ্চিত কিছু নগদ অর্থ নিয়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। ১৯১১ সালে কলকাতার তালতলায় মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে মরহুম স্বামীর নামানুসারে নবপর্যায়ে 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস' স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় কলকাতাতেও পর্দা প্রথা মানা হতো কঠোরভাবে। তিনি পর্দাপ্রথাকে আশ্রয় করেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করেন এবং স্কুল পরিচালনার জন্য অনেক সময় বিত্তবানদের দ্বারপ্রান্ত হন। ধীরে ধীরে স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ১৯১৬ সালে একশ ছাড়িয়ে যায়। 

শিক্ষার পাশাপাশি রোকেয়ার ইচ্ছে ছিল নারীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষা এবং স্বাবলম্বনই নারীকে মুক্তি দিতে পারে। তাই ১৯১৬ সালের কলকাতায় 'আঞ্জুমান খাওয়াতীনে ইসলাম' নামে মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর '১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সম্মেলনে রোকেয়া বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন, যা সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল দুঃসাহসিক কাজ।'

এই সংগ্রামশীল নারীর জীবনাবসান(১৯৩২) ঘটলেও তিনি বিশ্বের দরবারে রেখে গিয়েছেন অসামান্য কৃতিত্ব। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্ম কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়নি বরং এর ফল আজও বিশ্বের প্রতিটি দেশে; প্রতিটি জাতির মধ্যে বিরাজমান রয়েছে। বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সমাজের মধ্যে এর ফল ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে। বাঙালি নারী জাতির জন্য তাঁর কৃতিত্বই আজ কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন থেকে বেরিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর ক্ষুরধার শাণিত লেখনি মাঝে মাঝে পুরুষশাসিত সমাজকে প্রবলভাবে আক্রমণ করেছে। সমাজে নারীদের প্রতি অবিচার ব্যঙ্গ-বিদ্রূপভাবে প্রতিবাদ করেছেন প্রবন্ধগুলোতে। তিনি প্রবন্ধে বলেছেন, 'যে শকটের এক চক্র বড় (পতি) এবং এক চক্র ছোট (পত্নী) হয়, সে শকট অধিক দূরে অগ্রসর হইতে পারে না; সে কেবল একস্থানেই ঘুরিতে থাকিবে।' রোকেয়া পুরুষ বিদ্বেষী নয় বরং নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছেন।