ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ডাকা অনির্দিষ্ট কালের ধর্মঘটের কারণে টানা তৃতীয় দিনের মতো দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। চলমান অচলাবস্থা নিরসনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকের কথা বলছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
আগামীকাল বুধবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হিলি স্থলবন্দরের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, ওই বৈঠকে প্রশাসনিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত এলে ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। অন্যথায় আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ধর্মঘটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের হিলি বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শত শত শ্রমিক ও কর্মচারী। সময়মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বন্দরের ব্যবসায়ীরা।
আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত ভারতের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার বা হিলি বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চালুর কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বুধবার পর্যন্ত হিলি স্থলবন্দর দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্য কার্যক্রম চালু হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামীকাল ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। ওই বৈঠকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে হিলি স্থলবন্দরের বাণিজ্যসংক্রান্ত সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের হিলি এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি বিকাশ মণ্ডল মঙ্গলবার সকালে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় হিলি স্থলবন্দর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখানে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেছেন, সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে গত রবিবার থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে সব ধরনের পণ্য রপ্তানি আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে।
হিলি বন্দর দিয়ে তিন দিন ধরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় ভারতের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত এলাকায় শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে আছে। এসব ট্রাকে থাকা পণ্য সময়মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারায় পচনশীল পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে এলসি খোলা ব্যবসায়ীরাও সময় মতো পণ্য না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
বাংলাহিলি কাস্টমস সি অ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহিনুর ইসলাম শাহিন মণ্ডল বললেন, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে হিলি বন্দর চালুর বিষয়ে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। টানা তিন দিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় বন্দরের আমদানি রফতানিকারক, সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট,পরিবহন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী ওয়াহেদুর রহমান রিপন জানান, অনেক ব্যবসায়ী এরই মধ্যে এলসি খুলেছেন। ভারতীয় অংশে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য দেশে না পৌঁছালে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই দ্রুত ভারতীয় অংশের প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি চালু করার দাবি জানালেন তিনি।
হিলি বন্দরের শ্রমিক গোলাপ হোসেন বলেছেন, প্রতিদিন কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাদের সংসার চলে। কিন্তু তিন দিন ধরে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক দেশে প্রবেশ না করায় কাজ বন্ধ, আয়-রোজগার ও বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে বন্দরের আমদানি রফতানি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের পরিবারে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকলেও হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা পারভেজ আহমেদ।
তিনি আরও জানান, পূর্বে আমদানি করা পণ্যের প্রয়োজনীয় কাস্টমসের কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিয়ম অনুযায়ী খালাসের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন,দীর্ঘদিন বাণিজ্য, বন্ধ থাকলে শুধু আমদানিকারক-রপ্তানিকারকরাই নয়, পরিবহন মালিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ বন্দরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজারো মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই দ্রুত দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে চলমান জটিলতার সমাধান করে হিলি স্থলবন্দরে স্বাভাবিক বাণিজ্য কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মতামত