শিক্ষাঙ্গন

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের রাজনৈতিক দায়: যে হিসাব আজ কেউ কষছে না

প্রিন্ট
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের রাজনৈতিক দায়: যে হিসাব আজ কেউ কষছে না

প্রকাশিত : ৯ আগস্ট ২০২৬, রাত ১১:২৪


আমরা কী রেখে যাচ্ছি, কাদের জন্য রাজনৈতিক আলোচনায় এই প্রশ্নটি খুব কমই গুরুত্ব পায়। অথচ আজ যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাদের ক্ষমতার মেয়াদ হয়তো পাঁচ বা দশ বছর। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করবে এমন মানুষ, যারা আজ ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, এমনকি যারা এখনো জন্মায়ওনি।

পরিবেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বহুদিনের। আজ যে নদী দূষিত হচ্ছে, বন উজাড় হচ্ছে, তার মাশুল দেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। রাজনীতিতেও বিষয়টি একই। শুধু নদী-বনের জায়গায় এখানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

একটি রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার শুধু সেতু, রাস্তা, মেগাপ্রকল্প বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে মাপা যায় না। বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন, নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ কতটা আছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দলনিরপেক্ষ এসবই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

কারণ প্রতিষ্ঠান একবার দুর্বল হয়ে গেলে তার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেখা যায়, আইন নয় ব্যক্তির ইচ্ছাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ব্যক্তি বা সরকার এই অবক্ষয় ঘটিয়েছে, তারা হয়তো তখন আর ক্ষমতায় নেই; কিন্তু তার দায় বহন করতে হয় পরের প্রজন্মকে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের তরুণদের রাজনীতি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। অনেক তরুণ বুঝেছে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতাবানদের বিষয় নয়; রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাদের জীবন, ভবিষ্যৎ ও অধিকারকে প্রভাবিত করে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও দাবিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ তা চোখের সামনে দেখিয়েছে।

তবে এখানেই নতুন একটি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে না। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, তারা ক্ষমতার সুযোগ পেলে একই অন্যায় করবে না এই নিশ্চয়তাও তৈরি করতে হবে।

প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতা যদি নতুন মুখে পুরোনো রূপে ফিরে আসে, তাহলে কোনো আন্দোলনের অর্জনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

তরুণদের শুধু ভোটার, মিছিলের কর্মী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারক হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের নীতিনির্ধারণের টেবিলে জায়গা দিতে হবে, প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। শক্তিশালী ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই একটি রাষ্ট্রকে টেকসই করে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও গণতন্ত্র, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই?

একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাস রাজনীতির ভাষা হবে, নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান?

উত্তরটি কোনো একদিন লেখা হবে না। আজকের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিটি অন্যায় কিংবা প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই সেই উত্তর লেখা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ আমাদের সামনে নেই, তাই তারা প্রশ্ন করতে পারছে না। কিন্তু একদিন তারা অবশ্যই হিসাব করবে আমরা তাদের জন্য কী রেখে গিয়েছিলাম।