সন্তানদের মুখে নিজে না খেয়ে খাবার তুলে দেওয়া, আদর যত্নে লালন-পালন করা সন্তানরা বড় হয়ে বৃদ্ধা মাকে যে দূরে ঠেলে দিতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা ফুলমনি মুরমু।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলওয়া ছাতনীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফুলমনি মুরমু'র তিন সন্তান থাকা সত্ত্বেও অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিজের কঙ্করসার দেহটা যেন আজ নিজের কাছেই বোঝা হয়ে গেছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধা এখন তাঁর ১৩ বছরের একমাত্র নাতিকে সাথে করে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার থেকে পাওয়া সামান্য বয়স্ক ভাতা তার জীবনের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না।
সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বসে অপলক দৃষ্টিতে হয়ত কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। চোখের দৃষ্টি শক্তি যে অনেক আগেই কমে গেছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।পাশেই তাঁর দেহের মতই ভাঙ্গা শরীর নিয়ে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র মাথা গোজার বাড়িটি। বাড়িটি দেখে বোঝাই যাচ্ছে বহুদিন মেরামত না করার কারণে ঘরের টিন একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানিতে ভেঙ্গে গেছে ঘরের একপাশের দেওয়াল। ঘরের বারান্দায় একটি পুরোনো চৌকি পেতে নাতিকে নিয়ে কোনো রকমে রাত যাপন করেন। মাথার ওপর ভাঙ্গা টিনের ছাদ থাকলেও সেখানে নেই নিরাপত্তা, নেই স্বস্তি।
নাতি স্যামুয়েল হেমব্রম যে বয়সে স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে অন্যের বাড়িতে। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টুকটাক কাজ করা আর গরু-ছাগল চরিয়ে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে দাদি-নাতির দিন। শিশুশ্রমের ওপর ভর করেই টিকে আছে এই ভগ্ন স্বপ্নের সংসার।
এ সময় ফুলমণি মুর্মু কাঁপা কণ্ঠে বলেন, তার চার ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই বিয়ে করেছে। বড় তিন ছেলে বিয়ে করে পাশাপাশি থাকলেও ভরণপোষণ তো দূরের কথা দেখতেও আসেননা। তার ছোট ছেলে তার সাথে থাকতো এবং তার দেখা শুনাও করতো। বেশ কিছু দিন আগে ছেলেটা মারা যায়। মৃত ছেলের একমাত্র সন্তান স্যামুয়েলকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। কথাগুলো বলতে গিয়ে তার চোখ- মুখে ফুটে উঠে দীর্ঘদিনের বেদনা।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে ফুলমণি মুরমু'র স্বামী তরু হেমব্রম মারা যান। এরপর থেকেই জীবনের কঠিন সংগ্রাম শুরু হয় তার। চার ছেলে ও দুই মেয়ের সংসারে এক সময় মুখরতা থাকলেও আজ সেই বাড়িতে নিস্তব্ধ। কিছুদিন আগে ছোট ছেলে মারা গেলে আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে জীবিত তিন ছেলে ও দুই মেয়ে থাকলেও কেউই বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ রাখেন না। এ সময় এলাকাবাসীর অনেকে বলেন, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন তারা।
ওই ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম রবিন জানান, শুধু মাত্র বয়স্ক ভাতা ছাড়া তাকে সরকারি অন্য কোন সুযোগ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এর আগে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ২নং পালশা ইউপি চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম প্রধানের সাথে একাধিক বার মুঠোফোনে যোগাযোগ চেষ্টা করা হলে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাসুদ রানার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে সরকারি বয়স্ক ভাতার আওতাভুক্ত থাকায় বিধি অনুযায়ী তাকে অন্য কোনো ভাতার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। তবে তিনি আশ্বাস দেন যে, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার জন্য চেষ্টা করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবানা তানজিন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন দিলে, আবেদনের প্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় গ্রহণ করা হবে।
মতামত